গরুর মাংসে ঘোড়ার দৌড়, লাগাম পরাবে কে?

গরুর মাংসে ঘোড়ার দৌড়, লাগাম পরাবে কে?

রাজধানীতে আবার বেড়েছে গরুর মাংসের দাম। নিয়ন্ত্রণহীন এই মাংসের বাজার। বিক্রেতারা বলছেন, কোরবানি ঈদ সামনে রেখে বাজারে এখন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দেশি গরু কম আসছে। মাংস ব্যবসায়ীদের দাবি, তাঁদের বিভিন্ন দাবি আদায় না হওয়ায় দাম বেড়েছে মাংসের। ক্রেতারা বলছেন, ধর্মঘটের নামে শুধু ব্যবসায়ীরা নিজ স্বার্থসিদ্ধি করে ক্রেতাদের গলা কাটছেন। 
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, হাতিরপুল বাজারে গরুর মাংস ৫২০ টাকা, কারওয়ান বাজারে ৪৮০ টাকা, কলাবাগান ও মিরপুরে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের মাংস বিক্রেতা মো. মুজিবর বলেন, বাজারে দেশি গরু আসছে না। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গরু বিক্রেতারা ব্যবসায়ীদের কাছে গরু বিক্রি করছেন না। কোরবানির পশুর হাটে বেশি লাভের আশায় গরু রেখে দিচ্ছেন। এ জন্য বাজারে গরুর সংকট। তাই দামও কিছুটা বেশি। তিনি ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে মাংস বিক্রি করছেন।
হাতিরপুল বাজারের মাংস বিক্রেতা শুক্কুর মিয়া হাঁকাচ্ছিলেন, ‘দেশি গরু লইয়া যান, ভালো মাংস লইয়া যান।’ কাছে গিয়ে দাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতি কেজি ৫২০ টাকা। বেশি নিলে কমায় রাখা যাইব।’ আশপাশের কয়েকটি দোকানেও দাম চাওয়া হচ্ছে ৫২০ টাকা। তবে দরদাম করে ৫০০ টাকায় কেনা যাচ্ছে।
মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার মাংস বিক্রেতা আবেদ কালু বলেন, গরু ভারত থেকে কম আসছে। এখন ৫০০ টাকায় মাংস বিক্রি করলে তাঁদের কিছুটা পোষাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এই দামে মাংস বিক্রি করলে সামান্য লাভ হচ্ছে।
হাতিরপুল এলাকায় মাংস কিনতে এসে কথা হয় ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা আবদুল আউয়ালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকবার দেখেছি ধর্মঘটের পর মাংস ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন। তাঁদের স্বার্থ হাসিল হয়েছে। আমাদের সেই বেশি দামেই মাংস কিনতে হচ্ছে।’ তিনি ৫০০ টাকা কেজি দরে মাংস কিনেছেন।
কারওয়ান বাজারে গরুর মাংস কিনতে এসে দাম শুনে মুরগি কিনছিলেন তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা মো. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘রমজান মাসে ৪৭৫ টাকা কেজি ছিল, এখন ৫০০ টাকা। মনে হচ্ছে, গরুর মাংস কেনা বন্ধ করে দিতে হবে। তাই গরু না কিনে মুরগি কিনে যাচ্ছি।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মাংসের বাজার কি এভাবেই নিয়ন্ত্রণহীন থাকবে? সরকার কি কোনো ব্যবস্থা নেবে না? 
ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার গরু-মহিষ ও দেড় হাজার ছাগল-ভেড়ার চাহিদা রয়েছে। এসব গরু-মহিষের বেশির ভাগ দেশের দক্ষিণ-উত্তরাঞ্চলের জেলা ও ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়। সংগ্রহের পর পশুর চালানের আবার বড় অংশ ঢাকার গাবতলী থেকে মাংস ব্যবসায়ীরা কিনে থাকেন। তাঁদের মাধ্যমেই রাজধানীর গরু-মহিষের মাংস চাহিদা মেটানো হয়। তাই গাবতলী পশুর হাটেই চাহিদার অধিকাংশ গরু-মহিষ বিক্রি হয়। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার গাবতলীর হাটে এসব পশুর বেচাকেনা বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম মাংস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণহীন থাকার কথা স্বীকার করে আগের সমস্যার কথাই তুলে ধরলেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত খাজনার চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করছেন গাবতলী পশুর হাটের ইজারাদার। এ কারণে প্রতিটি গরুর জন্য বাড়তি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে তাঁদের। এ ছাড়া তাঁদের কার্যক্রম চালানোর কোনো সুযোগ নেই। তাঁদের নির্ধারিত গাবতলীর অফিস সন্ত্রাসীরা দখল করে নিয়েছেন। তিনি জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন একবারের জন্যও মাংসের দাম কমানোর বিষয়ে আলোচনায় বসেননি। উল্টো গরু জবাই করার জন্য বাড়তি টাকা নিচ্ছে। তাই বাড়তি দামেই কেজিপ্রতি ৫০০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের। দাম কমাতে যেকোনো সময় সিটি করপোরেশনের সঙ্গে তারা বসতে প্রস্তুত আছে বলে জানান তিনি। ধর্মঘটের পর বারবার কেন দাম বাড়ে—এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
মাংসের বাজার তদারকির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেসবাহুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যত দূর শুনেছি, ভারতীয় গরুর সরবরাহ কম থাকার কারণে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে। তবে আমাদের তালিকাভুক্ত মাংস বিক্রেতারা দাম বাড়িয়েছেন কি না, এ ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বেশি দামে মাংস বিক্রি সমাধানে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’