সৈকতে সবুজ জনপদ-হরিণঘাটা বনভূমি

সৈকতে সবুজ জনপদ-হরিণঘাটা বনভূমি

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের মানচিত্রে সগৌরবে মাথা উচু করে আছে দক্ষিনের জেলা বরগুনা। ভৌগলিক স্থান বিবেচনায় যার দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর, তাছাড়াও এজেলার বুকের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে বিষখালি আর পায়রা নামক বৃহৎ দুটি নদী। বঙ্গোপসাগর ঘিরে এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গড়ে তুলেছে তাদের মৎস কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য। উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরে সারা বাংলাদেশে ইলিশের স্বাদ পৌছে দিতে বরগুনার মানুষগুলো আলোচনায় ছিল অনেক আগে থেকেই।  জোয়ার ভাটার চিরায়ত খেলা আর গাংচিলের মিছিল বরগুনাকে সর্বদা জাগিয়ে রাখে তার গৌরবের নিজস্ব শব্দে।
নদী আর নোনা পানিকে ঘিরে বরগুনার মানুষ গড়ে তুলেছে তাদের নিজস্ব কিছু সংস্কৃতি। উপকূলীয় এই জেলাটিতে রয়েছে রাখাইন উপজাতির বসতি, আছে কিছু ছোট ছোট ম্যানগ্রোভ বনভূমি। আছে ইলিশ সাম্রাজ্য পাথরঘাটার মৎস বন্দর, আশারচর আর লালদিয়ার চরের শুঁটকীপল্লী, বেতাগীর ঐতিহাসিক বিবিচীনি মসজিদ, হরিণঘাটা বনভূমি আর তার সাথে নতুন গৌরবে আলোচ্য তালতলির সোনাকাটা। সব মিলিয়ে বরগুনা যেন অপার সৌন্দর্যে সৈকতে সবুজ জনপদ। তাই বলাই চলে বরগুনা হতে পারে বরিশাল বিভাগের অন্যতম পর্যটন অঞ্চল।
হরিণঘাটা বনভূমি বরগুনা জনপদে সৈন্দর্যের একটি বিশেষ নাম। বরগুনা পাথরঘাটা উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিঃমি দক্ষিনে হরিণঘাটা বাজার। গোটা দশেক দোকানের ছোট্ট বাজার ভেদ করে একটু আগালেই হরিণঘাটা বনকেন্দ্র। হরিণঘাটা বন কেন্দ্রের অধিনে আছে ১২শ একর বনভূমী। প্রকৃতির নিয়মে সুদির্ঘ বছর ধরে গড়ে উঠেছে হরিণঘাটা বনভূমি। গরান, গেওয়া, ছৈলা আর কেওরা গাছের নয়নাভিরাম এ বনভূমিতে রয়েছে হরিন, বানর, শুকরসহ প্রায় অর্ধ শতাধিক প্রজাতির বন্য প্রানী। নানা প্রজাতির পাক-পাখালিতে ভরা এই বনভূমিটি দর্শনার্থীদের জন্য অনেক বেশী নিরাপদ। কারন এ বনটি বাঘ শূন্য। নেই তেমন কোন হিংস্র প্রানীও। দুই একটা সাপের দেখা মিললেও মানুষের উপস্তিতিতে দ্রুত আড়াল করে নেয় নিজেদের।  বনের গভীরে যেখানে  প্রতিধ্বনিত হয় পাখির কুজন সেখানেই হয়তো মিলবে হরিনের দেখা।  ঘন্টার পর ঘণ্টা হাটলেও বন শেষ নাও হতে পারে, কারন দিকভ্রম অচেনা পথিক হয়তো বারবার ফিরে আসে একই স্থানে।
এই বনভুমির ভিতর দিয়ে জালের সুতোর মত বয়ে গেছে অসঙ্খ নদী আর খাল।  নির্দয় নদীগুলো পথহারালে আর সামনে জেতে দেবেনা।  নির্দিষ্ট পথ ধরে এগোলে পাওয়া যেতে পারে গাছের সাঁকো। ছোট্ট নদীর দুপার থেকে দুইটি গাছ সুইয়ে দিয়ে নির্মাণ করা হয় এই সাঁকো। এই সাঁকো পেড়িয়ে বনের লোকজন যাওয়া আসা করে বনের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে।
হরিণঘাটা বনভূমি যেখানে সৈকতে মিশেছে সেখানে পৌছলে মনে হবে এ যেন অবাক সৌন্দর্যের আরেক পৃথিবী। এই পৃথিবীর নাম লালদিয়া।  পায়ে হেটে বন পাড়ি দিয়ে অনেকের পক্ষে যখন লালদিয়া পৌছান সম্ভব নয়, তখন সাচ্ছন্দের বিকল্প উপায় ছোট্ট ছোট্ট ট্রলার। হরিণঘাটা বনকেন্দ্র থেকে ছোট ছোট একাধিক নদী লালদিয়ার চর হয়ে মিশেছে সাগরের মোহনায়। এসব নদী বয়েই পৌছতে হয় লালদিয়ার চরে। নদীপথ ধরে আগানোর সময় ঢেউয়ের প্রতিযোগিতা আর রং-বে-রঙ্গের কাঁকড়ার খেলা দেখলে মনে হবে বৃথা নয় হরিণঘাটা ভ্রমন। এই নদীগুলি দেখলে মনে হবে, সুবুজ কোন আর্টপেপারে নরম তুলির আকা কোন নয়নাভিরাম দৃশ্য। পটল চেরা চোখে যেন দীর্ঘ কাজল যোগ করেছে এই নদীগুলো।
ইতোমধ্যে সরকারের তরফ থেকে এই বনভূমিটিকে আরো সৌন্দর্যমন্ডিত করতে জলবায়ু ট্রাস্টের ফান্ডে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। এর মধ্যে রয়েছে- পর্যটক টাওয়ার নির্মাণ, পর্যটকদের বসার জন্য গোলঘর নির্মাণ, বনের মধ্য দিয়ে ওয়াক ওয়ে নির্মান।তবে হোটেল মোটেল না থাকায় দুরদুরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
এখানে ঘুরতে আসা এক দর্শনার্থী শহিদুল ইসলাম স্বপ্ন বলেন, স্থানটি খুব সুন্দর এখানে নিরিবিলি পরিবেশে প্রকৃতিকে উপভোগ করার সকল উপাদান বৃদ্ধমান। কিন্তু কোন হোটেল মোটেল না থাকায় বিকাল হলেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। ভালো হতো যদি এখানে রাতে থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করা যেত।
এবিষয়ে বরগুনা জেলা প্রশাসক ড. মোহা: বশিরুল আলম বলেন, পর্যটন শিল্পে বরগুনার রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এখানে গড়ে উঠতে পারে দেশের মধ্যে অন্যতম সেরা পর্যটনন স্পট। সরকারের সিংশ্লিষ্ট মহলের নিকট এবিষয়ে জানাবেন বলে তিনি আশ্বস্থ করেন।